আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বর্তমানে ব্যারেলপ্রতি ৬০ ডলারের আশপাশে, যা গত চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কারোপের পর বিশ্ববাজারে গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) দাম ব্যারেলপ্রতি ১০ ডলার কমে গেছে। বিশ্ববাজারের সঙ্গে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করে পণ্যটির দাম কমানোর বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। এটা করতে পারলে দেশে উৎপাদন, পরিবহনসহ সব খাতেই ইতিবাচক প্রভাব পড়বে; কমবে মূল্যস্ফীতির হার।
জ্বালানি বিভাগ ও বিপিসি কর্মকর্তারা বলছেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের বর্তমান দাম স্থিতিশীল থাকলে প্রাইসিং ফর্মুলায় প্রভাব পড়বে। এতে তেলের দাম কমানোর বড় সুযোগ দেখছেন তারাও। তবে একই সঙ্গে ডলারের দামও স্থিতিশীল থাকতে হবে বলে জানান তারা।
বিপিসির চেয়ারম্যান মো. আমিন উল আহসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে গত এক সপ্তাহে বড় দরপতন হয়েছে। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের প্রাইসিং ফর্মুলায় বড় প্রভাব রয়েছে। আমরা আশাবাদী দাম কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।’ তবে লিটারপ্রতি ঠিক কতটা দাম কমতে পারে সে বিষয়ে তিনি কিছু বলতে চাননি। বিপিসি প্রতি মাসের ২০ তারিখ থেকে পরবর্তী মাসের ২০ তারিখ পর্যন্ত জ্বালানি তেল আমদানির পার্সেলের মূল্য হিসাব করে প্রাইসিং ফর্মুলায় দাম নির্ধারণ করে। আমিন উল আহসান বলেন, ‘বর্তমান দামের স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে দেশের জ্বালানি তেলের মূল্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে এ সময়ে ডলারের দামও স্থিতিশীল থাকতে হবে। নতুবা দাম কমানোর ক্ষেত্রে ডলারের ইমপ্যাক্ট আবার প্রাইসে প্রভাব ফেলবে।’
দেশে জ্বালানি তেলের চাহিদা পূরণ করা হয় বিশ্ববাজার থেকে আমদানি করে। দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ করা হয় প্রাইসিং ফর্মুলায়। বিশ্ববাজারে দাম নিম্নমুখী হওয়ায় এখন দেশের বাজারেও দাম কমানোর জন্য সরকারের হাতে বড় সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টরা।
জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজার পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান অয়েল প্রাইস ডটকমের তথ্য অনুযায়ী, বতর্মানে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ডব্লিউটিআই ক্রুড অয়েলের ব্যারেলপ্রতি দাম ৬০-৬১ ডলারের (এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত) মধ্যে ওঠানামা করছে, যা গত ৩ এপ্রিল ব্যারেলপ্রতি ছিল ৭১ ডলার ৮১ সেন্ট। অন্যদিকে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েল ব্যারেলপ্রতি ৬৪ ডলার ৫৩ সেন্টের কিছু বেশিতে বেচাকেনা হচ্ছে। অথচ এক সপ্তাহ আগে ব্যারেলপ্রতি মূল্য ছিল ৭১ ডলারের কিছু বেশিতে। দুটি পণ্যের দাম সপ্তাহের ব্যবধানে ১০ ডলারের বেশি কমে গেছে।
বিপিসি-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রতি মাসের ২০ তারিখ থেকে পরবর্তী মাসের ২০ তারিখ পর্যন্ত আমদানি করা জ্বালানি তেলের গড় মূল্য হিসাব করা হয়। এরপর প্রাইসিং ফর্মুলা অনুযায়ী দাম নির্ধারণ করা হয়। এ মুহূর্তে সেই সুযোগ নেই। তবে বিশ্ববাজারে দাম স্থিতিশীল থাকলে সামনের মাসে দেশে দাম কমানোর বড় সুযোগ রয়েছে।
কয়েক বছর ধরে জ্বালানি তেলের বাজার বড় ধরনের উত্থান-পতনের মধ্য নিয়ে যাচ্ছে। তবে ২০২০ সালের পর এবারই প্রথম জ্বালানি তেলের বড় ধরনের দরপতন হলো। ২০২০ সালে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের (ব্রেন্ট ক্রুড অয়েল) দাম ছিল গড়ে ৪২ ডলার। পরের বছর অস্থির হয়ে ওঠে তেলের বাজার। তবে সবচেয়ে বেশি উল্লম্ফন হয় ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর। ওই বছর তেলের গড় দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়, সর্বোচ্চ দাম ওঠে ১৩৯ ডলার। ২০২৪ সালেও জ্বালানি তেলের গড় দাম ৭০ ডলারের আশপাশে ছিল।
দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বিশ্ববাজারের সঙ্গে সমন্বয় করতে গত বছরের মার্চ থেকে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে মূল্য নির্ধারণ শুরু করেছে সরকার। এরপর থেকে প্রতি মাসে ডিজেল-কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রলের দাম ঘোষণা করা হচ্ছে। দুই মাস ধরে দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। এ হিসাবে বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেল বিক্রি হচ্ছে ১০৫ টাকায় আর পেট্রল ১২২ ও অকটেন ১২৬ টাকায়।
জ্বালানি বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দরপতন স্থিতিশীল কিছু নয়। আমরা বিপিসিকে পর্যবেক্ষণ করতে বলেছি। স্থিতিশীল থাকলে আগামী মাসে দামে ইতিবাচক কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাবে। তবে ডলারের বাজার অস্থিতিশীল হলে দাম কমার ক্ষেত্রে বড় অনিশ্চয়তা রয়েছে।’
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমে গেলে দেশের বাজারেও তা দ্রুত অনুসরণ জরুরি বলে মনে করেন অনেক বিশেষজ্ঞ। কারণ জ্বালানি তেলের দাম কমলে সব ধরনের সেবার উৎপাদন ব্যয় ও দাম কমে আসবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক ম. তামিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দামের ফর্মুলা বিগত সরকারের করা। বাজারভিত্তিক হলে জ্বালানি তেলের দাম যৌক্তিক পর্যায়ে কমিয়ে আনা সম্ভব। তার চেয়ে বড় কথা জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ বিইআরসির কাছে ছেড়ে দেয়া উচিত। বিইআরসি সব ধরনের জ্বালানি পণ্যের দাম নির্ধারণ করছে। তেলের দাম তাদের কাছে ছেড়ে দিতে সমস্যা কোথায় সরকারের?’